artk
বুধবার, মে ২২, ২০১৯ ১১:৫৯   |  ৮,জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

বঙ্গ রাখাল

মঙ্গলবার, এপ্রিল ৩০, ২০১৯ ৯:৫৭

কবি বদরুল হায়দার : কবিতার দক্ষ তীরন্দাজ

media

কবিতা পৃথিবীর আদি এক নান্দনিক ধারা, যা কবির কল্পনার ভেতর দিয়ে চিন্তা ও অভিজ্ঞতাকে প্রকাশ করে। কবি কবিতাকে প্রকাশ করেন আকার-ইঙ্গিতের মধ্য দিয়ে যার মধ্যে রয়েছে ছন্দ, অলংকার। কবি কবিতাকে কখনো পাঠকের কাছে উন্মুক্ত করে দেন না। একটি কবিতার মধ্যে লুকানো থাকে সারা পৃথিবীর পাঠ্য যা পাঠক নিজের মতো করে আবিষ্কার করে নেবেন। কবিতার শরীর কবির ইচ্ছার অধীন। তিনি খেলবেন কবিতার শরীর খেলা। কবিতা সব সময় সমকালকে ধারণ করে তার শরীরে। কিন্তু অনেকে বলতে পারেন, কবিতা তো কবির অধীন তাহলে কবিতা কি করে সমকালকে ধারণ করবে। কবিই সমকালীন দৃশ্যত-অদৃশ্যত সব কিছুর সমন্বয় ঘটাবেন কবিতায়। আর এই এক একটি কবিতায় হতে পারে কালের সাক্ষীর ইতিহাসের অংশ। আদি কবিদের হৃদয় যন্ত্রণায় সৃজিত হয়েছে শ্লোক; এগুলো তাদের চিত্তের এক বাচনিক প্রকাশ। তবুও এই শ্লোকের মধ্যে রয়েছে ইতিহাস। কালকে কিংবা তাদের পারিবারিক-সমাজ বাস্তবতাকে তারা এড়িয়ে যেতে পারেনি। হৃদয় আর্তির যে বাণী সে দিন তাদের মুখে মুখে সৃজিত হয়েছে। সেটাই আদি কবিতা। এই আদি কবিতাতেই রয়েছে তাদের হৃদয়ানন্দের এক অভিজ্ঞান যার অন্তর্জগতে রয়েছে তাদের হৃদয় প্রশান্তি, তবে এই কবিতাতে নান্দনিকতারও বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। কবির অন্তর জগতে যখন এক ধরনের রসক্রিয়া কিংবা অভিজ্ঞানের সৃজন হয় তখনই কবি এই দ্বন্দ্বের তাড়িত রসকে ছন্দোবদ্ধ করে রূপ দেন শিল্পে-এ থেকেই রূপান্তিত হয় কবিতা। এই কবিতা এক সময় মহৎ মহান কবিতায় পরিণত হতে পারে। 

প্রাচীন গ্রিক মহাকবি হোমার কাব্য-সৃজনের অনুপ্রেরণার সন্ধানে শরণাপন্ন হয়েছিলেন সৃজনীশক্তির অধিষ্ঠাত্রী দেবী রূপী মিউজ (muse) এর। ইংরেজ কবি মিল্টন তার ‘প্যারডাইস লস্ট’-এর ইনভোকেশন অংশে দ্বারস্থ হয়েছিলেন গোটা বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের নিমার্তা ঈশ্বরের সৃজন আত্মার ধারক ঐশী শক্তির ‘The still small voice’ থেকে। তিনি বলেছেন,  ‘heavenly muse’. [ সাহিত্যের রূপ-রীতি ও অন্যান্য প্রসঙ্গ-কুন্তল চট্টোপাধ্যায়, কবিতার জন্ম রহস্য, পৃ.২১] কবি একজন প্রকৃতি শব্দশিকারী। তার হাত ধরেই কাব্যে সৃষ্টি হতে পারে নতুন নতুন কাব্য ব্যঞ্জনা। কবি কবিতাতে শব্দ নিয়ে খেলেন। শব্দের কারুকাজেই যেন নতুন নতুন কবিতার জন্ম হয়। এই খেলার মধ্যে মিশেল ঘটে কবির আত্ম উপলব্ধি আর অভিজ্ঞতার যাপিত জীবন। যাপিত জীবন কবিতায় এক বিশাল ভূমিকা পালন করে। কবি কবিতায় আবিষ্কার করেন নতুন নতুন শব্দ আর আমাদের মগজে দৌঁড়ে চলা শব্দের ঘোড়াদের কাব্য থেকে পছন্দের শব্দকেই তিনি হাজির করেন কবিতায়। রোমান্টিক কবিহৃদয়ের মধ্যে ওয়ার্ডস ওয়ার্ড, কোলরিজ, শেলি, কিটস এদের কবিতা সম্পর্কে এক একজনের এক এক মতবাদ- সহজেই দৃষ্টিগোচর হয়। তবে তারা কবিতায় ভাষা এবং আঙ্গিক নিয়ে অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা করছিলেন। যার চাক্ষুস প্রমাণ মেলে- ওয়ার্ডস ওয়ার্থের লিরিক্যাল ব্যালাডস্ এর  ‘ভূমিকা’ কোলরিজের ‘বায়োগ্রাফিয়া লিটাররিয়া’ শেলির ‘ডিফেন্স অব পোয়েট্রি’ আর কিটসের ‘পত্রগুচ্ছ’ কাব্যতত্ত্ব জিজ্ঞাসার ইতিহাসে এক অমূল্য সম্পদ হিসেবে পরিগনিত হয়। কবিদের এত এত পরীক্ষা কিংবা নিরীক্ষা ধর্মী কবিতা লেখা হয়েছে এবং হচ্ছে। তা কাদের জন্য? নিশ্চয় পাঠকের জন্য। কবিতায় যা কিছুই থাকুক না কেন এসব কবিতা পাঠককে নিজের উপলব্ধি আর নিজ মননের আলোকে অনুভব করতে হয় কবিতায় অন্তর জগতের ভাবতত্ত্ব। এ জন্যই কবিকে মাথায় রাখতে হবে পাঠকের কথা- এ কথা অনেকে বললেও একথা আমি মানি না। কবি তার কবিতা তার মতো করে সৃজন করবে আর পাঠক নিজের পরিমিতি বোধ দ্বারা আস্বাদন করবে কবিতার রূপ-রস আর সৌন্দর্যের কারিশমা। কবি এক দক্ষ কারিগর শব্দ শিকারী- তিনি থাকেন কবিতার কাঠামো সৃষ্টির এক কঠোর ধ্যানে। কবি উপমার ব্যাবহার করতে শিখেছেন বলেই অনেক কঠিন কথা অবলীলায় বলে যেতে পারেন। উপমা প্রয়োগ করে হেঁটে যেতে পারেন মধ্যে রাতে, ছুঁয়ে দেখতে পারেন পৃথিবীর শরীর; হাতের মুঠোয় আনতে পারেন চাঁদ, মঙ্গল দেশের পতিত ভূমি চাষ দিয়ে জন্মাতে পারেন হাজার হাজার মণ শষ্য। এসবই কবি উপমার প্রয়োগে করতে পারেন। চর্যাপদের উপমার ব্যবহার লক্ষ করা যায় তবে এটা কোনো সহজ উপমার ব্যাবহার ছিল না। এই উপমা ব্যবহারের মধ্যে ছিল প্রগাঢ় অধ্যাত্মবোধ। কবি বদরুল হায়দারের কবিতায়ও আমরা গভীরভাবে উপমার ব্যাবহার দেখতে পাই-

১. সময় বয়ে গেলে কালো জোৎস্নার রঙ গাঢ় হয়

   শব্দের স্লিপার চিৎ হয়ে থাকা বেদনার ওপর

   কেবলই গতির অন্তর জুড়ে যন্ত্র মানবের আনাগোনা। (সময় বিক্রির গল্প)

২. আমি টাঙানো মশারি থেকে নীলাকাশের পর্দা ছিঁড়ে ফেলি

   মগজের কোষে বোধের পৃথিবী সাত রঙে জন্ম হয়। (তুমি প্রেম কাম আমি মানুষের নাম)

৩. আমি আষাঢ়-শ্রাবণ ভাদ্র-আশ্বিনের লতানো প্লাবনে

   ভেসে ডুবে হই মা মাটি ও মানুষের প্রিয়জন। (মালতীলতার মন)

৪. বালিহাঁস উড়ে যাচ্ছে স্বপ্নস্বাদ,

   আমি সমগ্র আকাশ হয়ে সূর্য চাঁদ

   দিনরাত শান্ত অবসাদ নিয়ে গড়ে তুলি নতুন আবাদ। (পুনর্জন্ম)

পাঠক অনেক সময় প্রশ্ন তোলেন, অনেকের কবিতায় ছন্দ নেই। ছন্দইতো কবি। আবার অনেক বোদ্ধা কবিতা পেলেই আগেই কবিতায় কোন কোন ছন্দ রয়েছে ছন্দের নিক্তিতে ওজন করেন। কিন্তু ছন্দ প্রধান কবিতাও অকবিতায় বা দুর্বল কবিতায় পরিগনিত হতে পারে। আসলে ছন্দ না  থাকলেও শিল্পমান সম্পন্ন কবিতা সৃষ্টি করা সম্ভব। এ পর্যন্ত আমরা যত উৎকৃষ্টমানের কবিতা পড়েছি সব কবিতাতেই ছন্দ রয়েছে। এজন্যই একটি সফল কবিতার জন্য ছন্দ প্রয়োজনীয়। ছন্দের ব্যাপারে কবি বদরুল হায়দার অনেক সচেতন। আমরা যদি তার ‘সময় বিক্রির গল্প’ কাব্যগ্রন্থটিতে দৃষ্টিপাত করি তাহলে দেখা মেলে তিনি ছন্দকে নানাভাবে তার কবিতায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার প্রয়াস পেয়েছেন এবং এক কবিতা থেকে অন্য কবিতাকে তার অভিজ্ঞান দ্বারা আলাদা-আলাদা ভাবে সৃজন করেছেন। যেখানে তার নিজস্ব এক মুন্সিয়ানার পরিচয় পাওয়া যায়।

২.

কবি বদরুল হায়দার সময় বিবেচনায় মধ্যআশির। কবিতায় তিনি সময়কে হৃদয় দিয়ে ধারণ করেছেন যে কারণে আমরা তার কবিতায় সময় উপযোগী আধুনিক শব্দের  প্রয়োগ লক্ষ্য করি। যা তাদের সময় কিংবা তার পরবর্তীদের কবিতায় এতো সময়কে ধারণ করে সময়ের প্রচলিত শব্দের প্রয়োগিক কবিতা খুব কমই চোখে পড়ে-

১. টেস্টটিউবের দুঃখরা উঁকি মারে সুখের ভ্রমরে।

    রিটায়ার্ড হার্ট নীল শার্ট পরে দুঃখ আদরে

    আমি স্বঘোষিত মনের গারদে ভুলি আত্মঘাত (টেস্টটিউবের দুঃখ)

২.  প্রি-পেইড মনের ইন্টারনেটে চলে সংকটের হিড়িক

    অপারের জালে তুমি মনের মাতালে গিলো মিসকলে। (বেদনার ট্রানজিট)

বদরুল হায়দার একজন আপাদমস্তক কবি। তার যাপিত জীবন বোধের মধ্যেই ছাপ লেগে আছে কবিতায়। এই কবিতাই তাকে বুদ্ধ করে রাখে। এক সময়ের রাজনীতি করা মানুষ সচেতনভাবেই চলে এসেছেন কবিতায়। কারণ তিনি বলতে চান ন্যায়ের কথা। উদ্ধার করতে চান মানুষের হারানো অধিকার, উটপাটন করতে চান সমস্ত শোষণের মূল। তিনি অন্যায় আর রাজনীতির অসৎ মানুষগুলোর সংস্পর্শে নিজেকে নোংরা করতে চান না। তাই তো হাতে তুলে নিলেন কলম আর লিখলেন-

গণতন্ত্র নারী না পুরুষ এরা বোঝে না

শব্দধ্বনি আর রাত জোনাকির আবরণে

রাতের রাজত্বে থেকে দিনের শাসন ভুলে যায়। (মাতাল কি নাগরিক)

আজ যারা রাজনীতি করে তাদের কণ্ঠে শোনা যায় গণতন্ত্রের শ্লোগান। আসলে তারা কি গণতন্ত্রেও অন্তর্নিহিত সারাৎসার বোঝে? তারা সাম্য আর ন্যায়কে ভুলে ক্ষমতার অপপ্রয়োগ করে- এজন্যই কবির ব্যঙ্গ উক্তিতে-‘গণতন্ত্র নারী না পুরুষ?’ কবি এই রাজনীতি চান না। যে রাজনীতি দখলের বাহানায় প্রশাসন ব্যবহার করা হয়। তার সরকারি বাহিনীর অসৌজন্য আচরণ কবিকে বারবার ব্যথিত করে সংবিধানের আজ অপপ্রয়োগ- এ যেন পাখিদের সংবিধান সংশোধন করা-

১. মানুষেরা এখনো কয়েদী

   খাকী দুপুরের ফেরারী গাড়িতে। (কয়েদী গাড়িতে এক দুপুর)

২. বাক-স্বাধীনতা নেই ঘরে ও বাইরে (অজ্ঞতার স্বরলিপি)

কবি সবাইকে দুঃখের কুয়াশা মোড়ানো সকালকে ভেদ করে সূর্যের সন্ধান দিতে চান, এই দুঃখের মেঘের অবসান করে। নিজের আজন্ম মুক্তির বাসনায় ছুটিয়ে চলেন দিগন্তের দিকে কারণ তিনি কবি- কবি স্বপ্ন দেখাতে জানেন গড়তে পারেন সমাজ-লোকালয়-ভয় কি?

কালো বারুদ ছুঁয়ে যায় মন

হিম শীতল বেদনায় হাতছানি

আর আমি কবি

শুধু বেদনায় নীল ঘোড়া

ছুটে যাই কেবলি মানুষ। (বৈপরীত্যে আমি ও ঈশ্বর)

এখন কবিতা কিংবা দুঃসাহসিকতার পরিচয় একজনই দিতে পারেন, তিনি কবি। কবি সুন্দরের প্রত্যাশী, যেখানে তিনি আত্মবিসর্জন দিতেও পিছ পা হন না-

যদি সুন্দর পৃথিবীর জন্য গোলাপ না ফোটে

আমি আত্ম-প্রতিরোধে বিশ্বাসী মানুষ হয়ে

আত্মহত্যা করতে বাধ্য হবো। (নদী ও নারীর প্রতি ভালোবাসা)

তিনি আর কোনো যন্ত্রণা, ক্ষোভ, ধ্বংস, বিসর্জন দেখতে চান না। কোনো বোনের চোখের জল গড়িয়ে পড়তে দেবেন না, যতক্ষণ এদেহে আছে ‘প্রাণ’ ততক্ষণ তিনি এসবকিছুর প্রতিবাদ করে যাবেন- আর কোনো বন্ধ্যাত্বের বিয়োগ নয়। সবার প্রতি এক ধরনের হুমকি প্রদর্শন তার, যা জেনে মানুষ সাবধান হয়ে যাবে আর অন্যায় করবে না। গড়বে সুন্দর সুহাসিনী মায়াময় বাগান। মানুষের প্রেমহীন জোড়াপাখি কুশলী প্রতিমা, মানুষ আজ প্রেমহীন তবুও মানুষকে মানুষের সাথে কুশল বিনিময় করেই বাস করতে হয়। মানুষের মধ্যে কোনো সম্পর্ক না থাকলেও অভিনয় রীতি মেনেই অতিবাহিত করতে হয় সময়। আমরা বাঁচি একাকি। তাই তো কবি আবার নিজেকে লুকিয়ে ফেলেন নিজের মধ্যে-

‘নিজের ভেতর নিজে ডুবে আছি ধ্যানে মগ্ন’ (অপরাজিত)

চারিদিকের অন্যায় অসাম্যতা লক্ষ করে কবি নিজেকে নিজের মধ্যে লুকিয়ে রাখতে চান। কোনো কিছুতে আর নিজেকে জড়াতে চান না। তবুও কি অন্যায় দেখলে কবি নিজেকে গুটিয়ে রাখতে পারেন। তিনি যে সমাজের বিবেক, তাকে কথা বলতেই হবে, সোচ্চার হতে হবে এ সব কুচক্রীগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে। শব্দ হতে দমন করতে হবে তাদের। তিনি কাগজের নৌকায় কালো ছবি একে নিজের শরীর খুঁজে বেড়ান। তিনি পৃথিবীর পথে পথে সত্য সন্ধানী এক সন্ত-সন্যাসী হয়ে বেরিয়ে আসেন। কবি নিজেই বলেছেন- “এম্রয়ডারী প্রাণীর ভিড়ে পৃথিবী ভ্রমণে মগ্ন থাকি” (যত জীব তত শিব)

কবির কবিতা পাঠে মনে হয় এ কবিতাগুলো আবেগহীন। কিংবা আগাগোড়া হয়তো বিশ্বকবিতা পাঠ করছি- যেখানে আবেগের বাড়াবাড়ি নেই- আলোচনায় যাওয়ার আগে একটি কবিতা পড়ে নিতে পারি-

‘তিল মাত্র শব্দ হলে পরিকল্পনার বারোটা বেজে যাবে

ঘুমিও না। আলো জ্বালিয়ে আমরা বসে থাকবো কৌশলে

যখনই প্রয়োজন হবে ব্যবহার করবো হৃদয় পিস্তলটি।

আমি বিছানার এক পাশে আর তুমি বসবে ওপাশে।

ঈশ্বর চেয়ারে বসে আছে। আমরা আলোতে বসে থাকলাম

আত্মাগুলি বের করে রাখলাম টেবিলের এক কোণে।

ফিসফিস শব্দ করলো কথারা। স্নেহধন্য

বিচিত্র পেশায় জানোয়ার ছিলো কথাগুলি।

 

আমাদের দুই জোড়া চোখ ভেন্টিলেটারের

ফাঁক দিয়ে আলো দেখে। আমরা একটি

রেল লাইনের সমান্তরাল মাত্রাকে খুঁজে বের করলাম

অনুসরণের দৃষ্টি আর ইন্দ্রীয় শলাকা রাখলাম

টেবিলের এক কোণে। তার সাথে এক বাক্স দেশলাই

আর মোমবাতি-

 

তারপর বাতিটি নিভিয়ে দেয়া হলো

আমরা দু’জন অন্ধকারে বসে থাকলাম। 

 

প্রিয় বন্ধুগণ, কোন কিছুর জন্যই এ সুযোগ হারাতে চাই না

তুমি আমাতে অবাধ্য হও আর আমিও তোমাতে।’

(তুমি আমাতে অবাধ্য হও আমি তোমাতে)

এ কবিতা পড়ে আমার মনে হয়েছে কোনো বিশ্ব কবিতা পড়ছি। কারণ আমরা আমাদের দেশীয় মেদযুক্ত আর নেরোটিভ বা বর্ণনাধর্মী কবিতা পড়ে পড়ে অভ্যস্ত যেখানে এমন মেদহীন কবিতা তো আবেগহীন মনে হতেই পারে। কবির অন্তরে আবেগ না থাকলে সে কোনো দিন কবিতা সৃষ্টি করতে পারে না। কিন্তু আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করাটাই জটিল। আর যিনি পারেন তিনিই তো সৃষ্টি করতে পারেন উৎকৃষ্ট মানের কবিতা। কবির পূর্ববর্তী কবিরা নেরোটিভ বা বর্ণনাধর্মী কবিতা অনেকেই লিখেছেন- শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, সৈয়দ শামসুল হক, হুমায়ুন আজাদসহ আরো অনেকে। এদের কবিতায় রূপ, রস গায়ে মেখেই তো কবিকে বড় হতে হয়েছে, যে কারণে তিনিও বর্ণনাধর্মী কবিতা যে লেখেননি তাতো নয়। তবুও কবিতাকে বুক চিরে পাঠকের মাঝে উপস্থাপন করেছেন যা পাঠক গ্রহণও করছেন। এই কাজটা প্রথম আশির দশকের কবি ফরিদ কবিরের কবিতায় ব্যাপকভাবে লক্ষণীয়। তিনি তার কবিতায় নানাভাবে কাঁটার চালিয়ে কবিতাকে চিরে চিরে সুঁই-সুতো দিয়ে আবার সেলাই দিয়ে পাঠকের কাছে পাঠিয়ে দেন। যা এক কবিতা থেকে অন্য কবিতা ভাবনা বা অভিজ্ঞানের দিকে থেকেও ভিন্নতার দাবি রাখে। কবি বদরুল হায়দার তাদের কবিতা গ্রহণ করলেও সৃজন করেছেন নিজের মনোজাগতিক উপলব্ধিতে চিন্তিত বিষয়কে যা কখনো কখনো পাঠাভ্যাসে নতুন নতুন দিগন্ত দ্বার উন্মোচন চেষ্টায় বদলে দিয়েছেন কবিতার ভাষা-প্রকরণ-রীতি।

কবি সবকিছু উপলব্ধি করেছেন বদলের দৃষ্টিভঙ্গিতে। যে কারণে তার কবিতার কাঠামোগত দিকেও লেগেছে পরিবর্তনের দোলা। কবিতার মধ্যেই করে চলেছেন বুদ্ধিবৃত্তিক বিশ্লেষণ। বদলে দিতে চেয়েছেন কবিতা বলার ঢং-

১. মাত্রা পাল্টাতে থাকে। শিকড় দীর্ঘ হয়।

   সময় আঁকড়ে ধরে। এগিয়ে যায়। থামে।

   তিনটি মানুষ বৃক্ষ হতে থাকে।

  (গুরু নমস্কার গুরু তিরষ্কার গুরু বটবৃক্ষ)

২. হৃদয় হরণ কৌশল বদলে যাচ্ছে অবিকল

   বাজার বাগে আনতে যত্রতত্র নতুন উদ্যোগ। আমি

   সমঝোতা আর প্রণোদনা ব্যয়ে অনাদায়ে-

   অজানার পায়ে বাঁধি পরোয়ানা ভোগান্তি অসুখ

  (অসঙ্গতির বিরহী পাঠ)

কবি বদরুল হায়দারের কবিতায় প্রেমও হয়ে উঠেছে বৈপরিত্যের বিষয়। যেখানে ব্যবধানটাই প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি যৌনতাকে বাদ দিয়ে স্পর্শ করতে চেয়েছেন শাশ্বত প্রেম। প্রেম প্রাণী এবং বস্তু উভয় ক্ষেত্রেই সময় এবং পরিবেশকে লালন এবং ধারণ করে। এটাই প্রকৃতি রহস্য। আর এ রহস্যের কারণেই তা চুম্বুকের মতো মানুষের জীবনে ধরা দেয় প্রথম জীবনেই। কবির অনুভব শক্তি তো আরো প্রখর, যে কারণে তাকে প্রেম আরো আগে স্পর্শ করে। মানুষের আকাঙ্খা দ্বিগুণ হলেই সেখানে মানুষ দুঃখও দ্বিগুণ পেয়ে থাকেন।

আকাঙ্খা দ্বিগুণ ছিলো বলে

আমাদের আত্মাগুলি

বেঁচে দিতে হচ্ছে

দিনের কলঙ্ক হাটে। (আমি তোমাকে ভালোবাসি)

মানুষের প্রত্যাশার সাথে প্রাপ্তির যেমন মিল রয়েছে তার চেয়ে অমিলটা রয়েছে বেশি। মানুষের আকাঙ্খা আকাশ ছোঁয়া হলে তাদের বিবেককে তখন আর রাখা যায় না ন্যায়ের দিকে, তখন বাধ্য হয়ে পিছিয়ে দিতে হয় বিবেক আর পা বাড়াতে হয় অন্যায়ের দিকে। এভাবেই দ্রুত মানুষের স্বপ্নেরা বদলে যায়।

ভালোবাসায় প্রত্যাশা করে পাশাখেলা জয় করেছি

আশাকে ঘিরে পাশ ফিরে দেখি-

তুমি ভালোবাসার মতো দাহ করো ধীরে (ভালোবাসার বদ অভ্যাস)

কবি মনে করেন এই দেহজ ভালোবাসা আমাদের সন্ন্যাস জীবনে কিংবা সাধনার জীবনে এক ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে এ জন্যই তো তিনি নারীকে দূরে দূরে রাখেন। তার যে নারীর প্রতি প্রেম-ভালোবাসা নেই- তা কিন্তু নয়। ‘তোমাকে জাগাবো বলে কুড়িয়ে এনেছি সূর্য’ (মুই তোরে কুচ পাঙ্গ)

এভাবেই কবি তার কবিতায় বারবার প্রেমিক কবি হয়ে উঠেছেন। তবে তিনি প্রেমিক হলেও অনেকটা সচেতন প্রেমিক। মাতাল বা ভাবের প্রেমিক নন। কবির কবিতাগুলোকে যদি যথার্থভাবে বিচার বিশ্লেষণ করি, তাহলে প্রথাগত কবিতা হিসেবে আমরা বদরুল হায়দারের কবিতাকে চিহ্নিত করতে পারি না। কেন না তিনি কবিতায় অনেক বিষয়কে নতুনভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন যা আমি দেখানোর চেষ্টা করেছি। তার কবিতায় অন্য কবিদের কবিতার মতো ক্ষোভ, অভিমান, প্রেম-ভালোবাসা, দেশপ্রেম, স্মৃতিচারণ, হাহাকার, ব্যাঙ্গাত্মকতা আসলেও তা এসেছে  অন্যভাবে, যা আমরা তার উপস্থাপনা কৌশলের মাধ্যমেই দেখতে পাই- এই কৌশলগত ভাবনা তার কবিতায় নতুন মাত্রা দান করেছে। যেহেতু তিনি একটা ভিন্নরকম জীবন যাপন করে আসছেন এবং তিনি কবি হলেও তো একজন সামাজিক জীব। যে কারণে সামাজিক বিষয়গুলো তো নিজের অবচেতন মনেই চলে আসবে। কবিতা বিশ্লেষণ করলে আমরা কিছু বিষয়কে মোটা দাগে চিহ্নিত করতে পারি-

১.  মানবিক বোধ

২. দেশপ্রেম বা মাতৃভূমির প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবোধ

৩. জৈবিক প্রেমের আবেগে চৈতন্যেও জাগরণ

৪. বিদ্রুপাত্মক শ্লেষে আত্মশুদ্ধির পথ সন্ধান

৫. দুঃখ, ক্ষোভ, যাতনা, হাহাকারের চালচিত্র

সত্তর, আশির দশকে লেখা হয় বর্ণনাধর্মী একরৈখিক, অধিক আবেগ প্রবণ, পুনরাবৃত্তিক মূলক কবিতা। কারণ সদ্য স্বাধীন স্বদেশ, যেখানে সবার চোখে জল, হৃদয়ে ক্ষরণ, এ সময় আবেগের কবিতা সে কারণেই বেশি লেখা হয়েছে বা স্মৃতি কবিতা। যে কারণে এই সত্তরের কবিতায় অনেকটা খাপছাড়া হয়েছে এবং এখানে তারা কবিতায় আড়ালটা উন্মোচন করে দিয়েছেন; রহস্য থাকেনি তবে আশির কবিরা এই আবেগকে অনেকটা কঠোর হস্তে দমন করে কবিতাকে করেছেন রহস্যময়। কেন না আমরা চর্যাপদে দেখেছি আলো-আঁধারি। কবিতার ভাষা সহজ সরল হয়ে কিন্তু এর অন্তর্নিহিত দর্শন হবে তত্ত্বে ভরপুর। যে কারণে কবিতায় থাকতে হবে রহস্য আর এ রহস্যের সাগরে ডুব-সাঁতার দিতে তো কবি সদাপ্রস্তুত। লুকোচুরি খেলা-ই তো কবির কাজ। কেন সে সাদামাটা কবিতা লিখে নিজেকে রহস্যহীন করে তুলবেন। পাঠক নিজের মতো করে আবিষ্কার করে নেবে কবিতায়। কবিতা পড়ে পাঠকের মনে ধাক্কা পেতে হবে, ভাবতে হবে অর্থ খুঁজে বের করতে হবে। তবেই না পাঠক কবিতায় উপস্থাপিত বিষয় নিয়ে মূলার্থ উদ্ধার করতে সক্ষম হবে। সাজিয়ে নেবে পৃথিবী বানিয়ে নেবে নিজের সব অর্থ আর এ দিক থেকে কবি বদরুল হায়দার দক্ষ তীরন্দাজ। 

রেলসেবা অ্যাপে মিলছে না একটি টিকিটও আর্জেন্টিনার চূড়ান্ত দল ঘোষণা অল্পের জন্য রক্ষা পেলো ৩ শতাধিক লঞ্চযাত্রী পিএসসিতে স্বাস্থ্য ক্যাডারে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ সিডনিতে বিএসসিএ’র ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠিত চিত্রশিল্পী ধোনি! ইতিকাফ ইবাদতকে ফলপ্রসূ করে তারায় তারায় মিলন সেপ্টেম্বর থেকে ফেইসবুক-ইউটিউব নিয়ন্ত্রণ করবে সরকার আট বছর বয়সেই ১০৬ ভাষায় পারদর্শী! ট্রেনের অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু বুধবার মেহেরপুরে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত ১ পানিশূন্যতা কি রোজা ভঙ্গের কারণ হতে পারে? পুলিশের ডিম ভাঙার তদন্ত শেষ, ওসিকে প্রত্যাহার সন্তানকে হাসপাতালে রেখে উধাও ‘বাবা-মা’ গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজ গণতন্ত্রের বিকাশে ভূমিকা রাখছে: স্পিকার রকেটের চেয়েও দ্রুত গতিতে জাল বুনে মাকড়সা! জামিনে কারামুক্ত হলেন বিএনপি নেতা রবি দেশজুড়ে বিড়ি ভোক্তাদের বিক্ষোভ, কর প্রত্যাহারের দাবি প্রভাবশালীদেরও আইনের মুখোমুখি হতে হচ্ছে: দুদক চেয়ারম্যান ভারতে নাগা জঙ্গিদের হাতে বিধায়কসহ নিহত ১১ যতদিন সিগারেট থাকবে ততদিন বিড়ি রাখার দাবি ভোক্তাদের বকেয়া মজুরি পরিশোধের শর্তে পাটকলশ্রমিকদের আন্দোলন স্থগিত রানার শেয়ারে দর বেড়েছে ৩৩ শতাংশ ৬৮ বছরের বৃদ্ধকে বিয়ে করছেন সেলেনা! ইভিএমে কারচুপি নিয়ে শঙ্কিত ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি বগুড়া উপনির্বাচন বর্জনের ঘোষণা বাম জোটের ছুটিতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন সাকিব-মুশফিকরা আত্মহত্যা প্ররোচনার মামলায় ৫ জনের ১৩ বছর কারাদণ্ড পুঁজিবাজারে সূচকের পতন