artk
মঙ্গলবার, নভেম্বার ১৯, ২০১৯ ৮:১০   |  ৫,অগ্রহায়ণ ১৪২৬
সোমবার, মার্চ ২৫, ২০১৯ ২:২৫

গণহত্যা দিবস ও ভয়াল ২৫ মার্চ

মুনির আহমদ
media
সকল প্রকার আলোকসজ্জা ও আনন্দমূখর অনুষ্ঠান আয়োজন পরিহার করে এই দিন-রাত্রিকে শোকাবহ অবয়বে দেখাই হবে যুক্তিযুক্ত। জাতির প্রত্যাশাও অনুরূপ।

২৫ মার্চ আমাদের জাতীয় জীবনে এক হৃদয় বিদারক দিন। বিশ্বের ইতিহাসে ঘৃণ্যতম হিংস্রতা ও নির্মম পৈশাচিকতার দিন। ১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বর্বর এক দানবীয় নিষ্ঠুরতায় মেতে ওঠে। গভীর রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে সশস্ত্র অবস্থায় ঝাঁপিয়ে পড়ে নিরস্ত্র ও নিরীহ ঘুমন্ত বাঙালিদের ওপর। শুরু করে ইতিহাসের ভয়াবহ নারকীয় হত্যাযজ্ঞ। কি নির্দয় ও বীভৎস ছিল সেই দৃশ্য! কি ভয়ংকর সেই অভিজ্ঞতা! চারিদিকে ভারী অস্ত্রশস্ত্রের গগন বিদারী শব্দ। রক্তের বন্যা আর সারি সারি লাশের স্তুপ। দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য ভয়ার্ত মানুষের আর্তচিৎকার। আকাশ ছোঁয়া আগুনের লেলিহান শিখা। দানবচক্রের লুটপাট আর ধ্বংসযজ্ঞের ক্ষত চিহ্ন। ভয়াবহ ও গণবিধ্বংসী এই হত্যালীলা আর ধ্বংসযজ্ঞ প্রত্যক্ষ করে বিশ্ববাসী হয় স্তম্ভিত, বিস্মিত। বেদনায় হয় অশ্রু সিক্ত। গভীর মর্মাহত।

বাঙালি জাতির জীবনে নেমে আসা ইতিহাসের এই জঘন্যতম গণহত্যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সংগঠিত হিটলারের গেস্টাপো বাহিনীর নিধনযজ্ঞের চেয়েও ছিল ভয়ংকর। ভিয়েতনামে মার্কিন সেনাদের দ্বারা সংগঠিত মাইলাই হত্যাকাণ্ডের চেয়েও ছিল বড় নির্মম ও পাশবিক। তাই বাঙালিদের জীবনে ২৫ মার্চের রাত নিষ্ঠুরতম ভয়াল কালরাত হিসেবে চিহ্নিত।

স্বাধীনতার পর সমগ্র জাতি মহান মু্ক্তিযুদ্ধের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে যথাযোগ্য মর্যাদায় ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস, ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস, ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস এবং ‘৫২’র ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে পালন করে আসছে ২১ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু ২৫ মার্চ বরাবরই থেকে গেছে অবহেলিত ও উপেক্ষিত। ভয়াল সেই রাত্রিতে যে সকল নিরীহ নিরস্ত্র বাঙালি শহীদ হলো এবং যাদের রক্তের বিনিময়ে সূচিত হলো মহান মুক্তিযুদ্ধ তাদের আমরা স্মরণ করবো না এমন জাতি নিশ্চয়ই আমরা নই।

দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, ২০১৭ সালের পূর্বে আমরা এই শহীদদের যথাযোগ্য মর্যাদায় স্মরণ করতে পারিনি। তাদের স্মরণে সুনির্দিষ্ট একটি দিবসও কোন সরকার ঠিক করে যায়নি। অথচ স্বাধীনতা যুদ্ধের বিশাল পটভূমিতে ২৫ মার্চ রাত্রির ভয়াবহ পরিবেশ ও পরিস্থিতির অবদান কোনভাবেই খাটো করে দেখার নয়।

গণহত্যার ঠিক ৪৬ বছর পর স্বাধীনতার স্থপতি ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগ ও প্রচেষ্টায় ২০১৭ সালের ১১ মার্চ জাতীয় সংসদ ২৫ মার্চকে ‘গণহত্যা’ দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ঐতিহাসিক এই পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সমগ্র জাতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও জাতীয় সংসদের নিকট কৃতজ্ঞ থাকবে চিরদিন। জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃতি পাওয়া এই দিনটি আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি অর্জনের জন্য তাঁর সরকার যথাযথ পদক্ষেপ নিবে বলেও তিনি সেই সময় প্রতিজ্ঞা ব্যক্ত করেন। জাতি প্রত্যাশা করে, তাঁর সরকারের আমলেই আন্তর্জাতিকভাবে এই স্বীকৃতি অর্জন সম্ভব হবে।

২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস ঘোষণার দাবিতে প্রায় দুই দশক আগেই শুরু হয়েছিল একটি সুশৃঙ্খল সামাজিক আন্দোলন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী বিভিন্ন সংগঠন এই আন্দোলনে সামিল হলেও বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রফেসর মুজিব খান যিনি বাংলাদেশ ছাত্র কল্যাণ সংস্থা তথা সিফাদ ফাউন্ডেশন এবং এর বিভিন্ন অঙ্গপ্রতিষ্ঠান যথা-ইউডা (ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভ), কোডা (কলেজ অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভ), সোডা (স্কুল অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভ) এর প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি তাঁর উদ্যোগ ও কর্মপরিকল্পনায় এই আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, যা ছিল সম্পূর্ণরূপে ব্যতিক্রমধর্মী এবং সর্বজনসমাদৃত। বিগত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তাঁর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানের প্রায় পাঁচ থেকে ছয় হাজার ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী প্রতি বছর ২৫ মার্চ সূর্যাস্ত থেকে ২৬ মার্চ সূর্যোদয় পর্যন্ত সারা রাতব্যাপী ঢাকা মহানগরীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে (সংসদ ভবনের সামনের রাস্তা সংলগ্ন খালি জায়গায়) ২৫ মার্চ রাত্রিটি কালরাত হিসেবে পালন করার পাশাপাশি এই দিনটিকে ‘গণহত্যা দিবস’ হিসেবে ঘোষণার দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছে।

কর্মসূচির উল্লেখযোগ্য দিকগুলির মধ্যে রয়েছে ২৫ মার্চ সূর্যাস্তের সাথে সাথে কালো পতাকা উত্তোলন, ১৯৭১ এর ওই রাতে নিহত এবং স্বাধীনতা যুদ্ধের শহীদদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে কোরআন তেলাওয়াত ও দোয়া প্রার্থনা, স্বাধীনতার আলো প্রজ্জ্বলন ও মৌন মিছিল, ইউডা’র চারুকলা বিভাগের শিক্ষক, শিক্ষার্থীসহ দেশের সর্বস্তরের চিত্রশিল্পীদের অংশগ্রহণে রাতব্যাপী গণহত্যা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাভিত্তিক পথচিত্র অংকন, দেশ বরেণ্য সঙ্গীত শিল্পীদের অংশগ্রহণে গণসংগীত, কবিতাপাঠ ও পথনাটক মঞ্চায়ন, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক চলচ্চিত্র ও প্রামাণ্য চিত্র প্রদর্শন, মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিচারণ এবং রাতব্যাপী অনুষ্ঠান শেষে ২৬ মার্চ ভোরে স্বাধীনতা দিবসের সূর্যোদয়ের সাথে সাথে জাতীয় সংগীত পরিবেশন ও কালো পতাকা নামিয়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলন। এই কর্মসূচিগুলো হয় শান্তিপূর্ণ, অহিংস এবং সুশৃঙ্খল পরিবেশে। দল, মত নির্বিশেষে ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, বিভিন্ন পেশাজীবী, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা, মুক্তিযোদ্ধা, চলচ্চিত্র, টিভি ও নাট্য ব্যক্তিত্ব, দেশবরেণ্য চিত্রশিল্পী, সংগীত শিল্পী, মন্ত্রী, এমপিসহ সমাজের সর্বস্তরের জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে এই অনুষ্ঠান হয়ে উঠে সর্বজনীন।

তাছাড়া প্রতিবছর সংসদ ভবনের সামনের রাস্তায় এই কর্মসূচি পালনের অনুমতি প্রদানে সংসদের মাননীয় স্পিকার, সংসদ সচিবালয়, সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষ, ঢাকা মহানগর পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ভূমিকাও প্রশংসনীয়।

বিগত দিনে জাতীয় পর্যায়ের অনেক সুধী, শিল্পী, রাজনীতিক এবং কৃতি ব্যক্তিত্ব এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে উৎসাহ যুগিয়েছেন। উল্লেখযোগ্যদের মধ্যে রয়েছেন জাতীয় সংসদের সাবেক ডেপুটি স্পিকার কর্নেল শওকত আলী, প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার সুভাষ দত্ত, টিভি ও নাট্য ব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ, দেশবরেণ্য চিত্রশিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী, রফিকুন নবী, মোস্তফা মনোয়ার, ফেরদৌসী প্রিয়ভাসিনী, সমরজিৎ রায় চৌধুরী, হাশেম খান, আবুল বার্‌ক আলভী, কালিদাস কর্মকার, বীরেণ সোম, মনিরুল ইসলাম, রুহুল আমীন কাজল, ফরিদা জামান, শিল্পী কনক চাঁপা, মনিরুজ্জামান, শিল্পী শহীদ কবীর, শিল্পী নাদিম আহমেদ নাদভী, শিল্পী অলকেশ ঘোষ, শিল্পী চন্দ্র শেখর দে, শিল্পী গোলাম ফারুক বেবুল, শিল্পী সিদ্ধার্থ শংকর তালুকদার, নাট্যব্যক্তিত্ব আফজাল হোসেন ও বিপাশা হায়াত, শিল্পী আব্দুর রাজ্জাক, মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরের ট্রাস্টি ও সদস্য সচিব ড. সরোয়ার আলী, সাবেক সেনা প্রধান মেজর জেনারেল হারুন-অর-রশীদ, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা সুলতানা কামাল, সাবেক মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ক্যাপ্টেন তাজুল ইসলাম, বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকা, কর্নেল জাফর ইমাম, ইউজিসির সাবেক চেয়ারম্যান ড. নজরুল ইসলাম, নৌ পরিবহন মন্ত্রী শাহজাহান খান এমপি, খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম এমপি, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু এমপি, অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী প্রমুখ।

২৫ মার্চের গণহত্যা ছিল পূর্ব পরিকল্পিত। তবে এর সূচনা হয়েছিল ইতিহাসের ধারাবাহিকতায়। বিশেষ করে ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের মধ্য দিয়ে বঙ্গদেশ ব্রিটিশদের করদ রাজ্যে পরিণত হওয়ার পর দুইশত বছরের পরাধীনতার শাসনামলে বাঙালিরা শোষণ, নির্যাতন ও নিপীড়ন ভোগ করলেও মনের ভিতর ধারণ করে হারানো স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের দৃঢ় সংকল্প। গড়ে তোলে ইংরেজ বিরোধী বিভিন্ন আন্দোলন, সংগ্রাম ও প্রতিরোধ। তারই ধারাবাহিকতায় গড়ে উঠে ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ, ১৮৬০ সালের নীল বিদ্রোহ, ১৯০৫ সালের স্বদেশি আন্দোলন। এই সব আন্দোলন ও সংগ্রামের ফলে ভারতবর্ষে ইংরেজ শাসনের অস্তিত্ব সংকটাপন্ন হয়ে উঠে। অবশেষে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালে ভারতীয় উপমহাদেশ দ্বি-খণ্ডিত হয়। বিশ্ব মানচিত্রে জায়গা করে নেয় পাকিস্তান ও ভারত নামে দু’টি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র।
 
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে। তাই পাকিস্তান রাষ্ট্রটির সঙ্গে বাঙালিদের সখ্যতা তেমন সুখকর হয়ে ওঠেনি। কেননা নব্য এই উপনিবেশিক শক্তি ছিল বৃটিশদের চেয়েও বড় ভয়ঙ্কর, কদর্য ও নীচ প্রকৃতির। চিন্তা চেতনা, মন-মানসিকতা এবং কর্মপরিকল্পনায়ও তারা ছিল সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক ও মানবতাবিরোধী। তাই ঐতিহাসিক নানা ঘটনা প্রবাহের মধ্যদিয়ে বাঙালিরা নিজেদের আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান শুরু করে। তাদের উপলব্দি হয়, ধর্মীয় অভিন্নতা থাকলেও পাকিস্তানের দুই অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর ভাষা, সাহিত্য, ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, আচার-আচরণ, মূল্যবোধ, দৃষ্টিভঙ্গি, বিশ্বাস ও উপলব্দির মধ্যে ফারাকটা বিস্তর। সীমাহীন দূরত্বের। অসম আকৃতির। যে কারনে উভয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে সুসম্পর্ক ও সমঝোতা প্রতিষ্ঠার জায়গাটি হয়ে ওঠে বন্ধুর। এই প্রেক্ষাপটে বাঙালিরা স্বজাত্য বোধের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে ১৯৫২-তে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করে।

পরবর্তীতে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে সম্পৃক্ত হয়ে ৫৪’র প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিজয় সুনিশ্চিত করে। যুক্তফ্রন্টের বিজয়ে পূর্ব-পাকিস্তানের জাগ্রত জনতার প্রতিবাদী চেতনা আরো শক্তিশালী হয় যা তাদের ৫৮’র সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার শক্তি ও সাহস যোগায়। ৬৬ সালে মুজিবের ৬ দফা পরিণত হয় বাংলার মুক্তি সনদে। তিনি হয়ে ওঠেন বাঙালিদের অবিসংবাদিত নেতা। ১৯৬৮-৬৯-এর ৬ দফা ভিত্তিক আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে পরিণত হয়। অভ্যুত্থানের স্রোতে ভেসে যান আইয়ুব খান। ক্ষমতায় বসেন ইয়াহিয়া খান। তিনি ঘোষণা করেন ১৯৭০ সালে জাতীয় পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। বহুল প্রতীক্ষিত ওই নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় পাকিস্তানের শাসন ক্ষমতায় বাঙালিদের অংশগ্রহণের সেই সুযোগটি তৈরি হলেও পাকিস্তানি শাসকচক্রের ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের কারণে তা ভেস্তে যায়। তাই বাঙালির স্বাধীকার আদায়ের আন্দোলন স্বাধীনতা অর্জনের সংগ্রামে পরিণত হয়।

৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর অসহযোগ আন্দোলনের ডাক ও রেসকোর্স ময়দানের উত্তাল জনসমুদ্রে তাঁর ঘোষণা “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম”- বাঙালি জাতি স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়। স্বপ্নের স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার দৃপ্ত শপথে তারা বলীয়ান হয়ে ওঠে। বঙ্গবন্ধুর ডাকা অসহযোগ আন্দোলনে তখন পূর্ব-পাকিস্তান সম্পূর্ণরূপে অচল হয়ে পড়ে। এতে শুরু হয় রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক সংকট। এই সংকট সমাধানে ইয়াহিয়া খান ১৫ মার্চ ঢাকায় আসেন এবং শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে দফায় দফায় আলোচনায় মিলিত হন। জুলফিকার আলী ভূট্টোসহ পশ্চিম পাকিস্তানের অন্যান্য নেতৃবৃন্দও ওই আলোচনায় অংশ নেয়। লোক দেখানো ওই আলোচনার আড়ালে তারা পূর্ব পাকিস্তানে সৈন্য সমাবেশ ও অস্ত্র মজুদ করার কাজ সম্পন্ন করে। রক্তলিপ্সায় ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রস্তুতি সম্পন্ন হলে মুজিব-ইয়াহিয়া-ভুট্টো আলোচনাকে ব্যর্থ করে ২৫ মার্চ ইয়াহিয়া ও ভুট্টো ঢাকা ত্যাগ করেন। পরিণামে বাঙালি জাতির জীবনে নেমে আসে ইতিহাসের ভয়াল কালরাত, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ। ওই রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী শুরু করে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামের এক পরিকল্পিত সামরিক অভিযান, যা নয় মাসব্যাপী দীর্ঘস্থায়ী হয়।

‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামের ওই সশস্ত্র সামরিক অভিযান নিছক বাঙালির জাতীয়তাবাদী আন্দোলন দমনের একটি সামরিক চেষ্টা মনে করার কোন কারন নাই। প্রকৃতপক্ষে এটা ছিল এক ভয়াল গণহত্যার নীল নকশা। যার প্রস্তুতি চলছিল অনেক আগে থেকেই। সাংবাদিক রবার্ট পেইন তাঁর ম্যাসাকার বইতে উল্লেখ করেন, ১৯৭১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারী পশ্চিম পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত এক গোপন সামরিক বৈঠকে ইয়াহিয়া খান বাঙ্গালিদের খতম করার সিদ্ধান্ত নেন। ওই বৈঠকে তিনি সেনা অফিসারদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, ‘ওদের ৩০ লাখ মেরে ফেলো। বাকিরা তোমাদের হাতের মুঠোয় চলে আসবে।’ উক্ত বৈঠকে গৃহীত প্রস্তাবনার ভিত্তিতে মার্চের শুরুতে ১৪তম ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল খাদিম হুসাইন রাজা এবং ৫৭ ডিভিশনের মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলি ‘অপারেশন সার্চলাইট’ এর মূল পরিকল্পনা তৈরি করেন। এ গণহত্যা শুরুর পরিপ্রেক্ষিতেই পরবর্তী সময়ে অস্ত্র হাতে মাঠে নামে মুক্তিমন্ত্রে দীক্ষিত বাঙালি।

‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামক সামরিক অভিযানের মূল উদ্দেশ্য ছিল ঢাকাসহ তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানের প্রধান প্রধান শহরগুলিতে আওয়ামী লীগের বিশিষ্ট নেতা ও ছাত্র নেতৃবৃন্দসহ বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের গ্রেপ্তার ও প্রয়োজনে হত্যা, সামরিক, আধাসামরিক ও পুলিশ বাহিনীর বাঙালি সদস্যদের নিরস্ত্রীকরণ, অস্ত্রাগার, রেডিও, টেলিফোন এক্সচেঞ্জ দখলসহ পূর্বপাকিস্তানের সামগ্রিক কর্তৃত্ব গ্রহণ এবং বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে পরিচালিত স্বাধীনতা আন্দোলন কঠোর হস্তে দমন করে বাঙালিদের ক্রীতদাসের জাতিতে পরিণত করা। বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা উদীয়মান বাঙালী জাতিসত্তাকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া। সেই জন্য বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ গণহত্যা সংঘটিত হয় বাংলাদেশে। ভয়ঙ্কর ওই রাতের অভিযানে কতজন হতাহত হলো তার প্রকৃত হিসাব না পাওয়া গেলেও রবার্ট পেইন বলেছেন যে, ওই দিন রাতে শুধু ঢাকা শহরেই ত্রিশ হাজার মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। ২৮ মার্চ’ ৭১-র নিউয়র্ক টাইমস দশ হাজার মানুষ নিহত হবার খবর দিয়েছিল। ২৯ মার্চ তারিখের সিডনি মর্নিং হেরাল্ড লিখেছিল নিহতের সংখ্যা দশ হাজার থেকে এক লাখ হতে পারে। এক রাতে এত বেশি সংখ্যক মানুষের মৃত্যু ও ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ আর কোন দেশে হয়নি। তাই বাংলাদেশের এই গণহত্যা তাই পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ হিসেবে স্বীকৃত।

এ প্রসঙ্গে নোবেল বিজয়ী আলফ্রেড কাস্টলার এর মন্তব্য উল্লেখযোগ্য। তিনি তার মন্তব্যে বলেছিলেন, হিরোসিমায় পারমানবিক বোমায় হত্যাকাণ্ডের চেয়েও বাংলাদেশে সংঘটিত গণহত্যা ছিল অনেকগুণ বেশি ভয়াবহ।

সমাজবিজ্ঞনী জে আর রুমেলও এই গণহত্যাকে ভয়াবহ উল্লেখ করে তার ডেথ বাই গভর্ণমেন্টস বইতে লিখেছেন, ইয়াহিয়া খানের শাসনামলে পাকিস্তানি সেনা ও তাদের সহযোগী আধাসামরিক বাহিনীগুলো প্রতি পঁচিশজন বাঙালির একজনকে হত্যা করেছেন যার সবচেয়ে কদর্য ও কুৎসিত চেহারা দেখা গেছে একাত্তরের দুইশ সাতষট্টি দিনে।

২৫ মার্চ রাত্রির ভয়াবহতা ভোলার নয়। এই রাত্রির ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা কাটিয়ে বাঙালিরা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ২৬ মার্চ চট্টগ্রামের কালুর ঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে আসে স্বাধীনতার ঘোষণা। ১৭ এপ্রিল মুজিব নগরে গঠিত হয় বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার। সরকার গঠিত হওয়ার পর পরই দেশব্যাপী স্বাধীনতা যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। এই সশস্ত্র সংগ্রামে দেশের আপামর সাধারণ জনতার সাথে যুক্ত হয় সেনাবহিনী, ইপিআর, পুলিশসদস্য। সুদীর্ঘ ৯ মাসের সশস্ত্র সংগ্রাম এবং ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয় আমাদের মহান স্বাধীনতা। যেহেতু মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের বিশাল পটভূমিতে ২৫ মার্চ রাত্রির ভয়ানক পরিবেশ ও পরিস্থিতির প্রভাব রয়েছে এবং জাতীয়ভাবে ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে তাই দিবসটির সম্মান, মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যতা রক্ষায় সকলকে আরো সচেতন ও দায়িত্বশীল হতে হবে। সকল প্রকার আলোকসজ্জা ও আনন্দমূখর অনুষ্ঠান আয়োজন পরিহার করে এই দিন-রাত্রিকে শোকাবহ অবয়বে দেখাই হবে যুক্তিযুক্ত। জাতির প্রত্যাশাও অনুরূপ।

লেখক: মুনির আহমদ, সহযোগী অধ্যাপক, ইউডা।

সেফুদার সম্পত্তি ক্রোকের আদেশ লবণ নিয়ে গুজব ছড়ালে কঠোর ব্যবস্থা: সরকার রাজস্ব আদায় ২ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে বুধবার থেকে বাস চলবে খুলনায় ৩৯তম বিসিএসে ৪ হাজার ৪৪৩ চিকিৎসক নিয়োগ অধ্যক্ষকে পুকুরে ফেলার ঘটনায় ছাত্রলীগের ৫ কর্মী গ্রেপ্তার খালেদা জিয়া দাঁড়াতে-বসতে বা হাতে তুলে খেতে পারেন না: রিজভী দুই সিটির ভোটবিরোধী ৩৬ কাউন্সিলর লবণ নিয়ে গুজবে কান না দেয়ার পরামর্শ কেজিপ্রতি ১০০ টাকা হওয়ার গুজবে লবণ কেনার হিড়িক খালেদার মুক্তির দাবিতে ২৩ নভেম্বর বিএনপির সমাবেশ খালেদার মুক্তির দাবিতে ২৩ নভেম্বর বিএনপির সমাবেশ খালেদার মুক্তির দাবিতে ২৩ নভেম্বর বিএনপির সমাবেশ খালেদার মুক্তির দাবিতে ২৩ নভেম্বর বিএনপির সমাবেশ ৩০ মামলার আসামি ‘পটেটো রুবেল’ অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার ৩০ মামলার আসামি ‘পটেটো রুবেল’ অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার ৩০ মামলার আসামি ‘পটেটো রুবেল’ অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার ৩০ মামলার আসামি ‘পটেটো রুবেল’ অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার প্রেম করছি কিন্তু বিয়ের দিন এখনও ঠিক হয়নি: জয়া অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি ট্রাক-কাভার্ডভ্যান মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের পাকিস্তানে অনুপ্রবেশের দায়ে ২ ভারতীয় গ্রেপ্তার মিথিলার সঙ্গে বিয়ে নিয়ে এবার মুখ খুললেন সৃজিত সাংবাদিকের চোখ হারানোর প্রতিবাদে চোখে ব্যান্ডেজ লাগিয়ে সংবাদ পাঠ এবার কন্যাসন্তানের বাবা হলেন তামিম প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরছেন রাতে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়ালমার্ট স্টোরে গুলিতে নিহত ৩ ‘বন্দুকযুদ্ধে’ জনসংহতির ৩ সদস্য নিহত তারেক রহমানই ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার কাজ শুরু করেন: ফখরুল রিভিউ পরিবর্তন: ইমনের পরিবর্তে কায়কোবাদ ২৮৭ জনকে নিয়োগ দিবে দুদক