artk
বৃহস্পতিবার, জানুয়ারি ২৪, ২০১৯ ৯:২১   |  ১১,মাঘ ১৪২৫
শনিবার, জানুয়ারি ১২, ২০১৯ ২:১৫

শফির বক্তব্য কতটা যুক্তিসঙ্গত?

মতিউর রহমান
media
‘জ্ঞান আহরণের জন্য সুদূর চীন দেশে যাও।’ এই বক্তব্যের পক্ষে আজ পর্যন্ত কোন ইসলামী আলেম কোন প্রমাণ দিতে পারেন নাই

গতকাল বাংলাদেশের সকল জাতীয় গণমাধ্যম একটি খবর অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে প্রকাশ করে। এই খবরটি হলো হেফাজতে ইসলামের আমির/প্রধান আল্লামা শফি সাহেবের নির্দেশ (অনুসারীদের প্রতি) মেয়েদের স্কুল, কলেজ এবং উচ্চ শিক্ষার জন্য যেন না পাঠানো হয়। 

প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী শফি সহেব বলেছেন, ‘হাইস্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার কারণে মেয়েরা বা নারীরা অনৈতিকভাবে অন্যের হয়ে যাবে বা অন্যের কাছে চলে যাবে।’ বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের আলোচনায় শফি সাহেবের বক্তব্যকে ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক হিসেবে বলার চেষ্টা করেছেন। নানা উপায়ে শফি সাহেবের বক্তব্যকে ইসলামি শিক্ষার বা বিধিনিষেধের পরিপন্থি বলার চেষ্টা করছেন।  

আমার নিজস্ব বিবেচনায় আল্লামা শফি সাহেব সত্যিকারার্থে ইসলামের সত্যিকার বিধান অনুযায়ী তার অনুসারীদের নির্দেশ প্রদান করেছেন। আমার প্রশ্ন যে সকল বিশেষজ্ঞ শফি সাহেবের বক্তব্যের সমালোচনা এবং ক্ষেত্রবিশেষ ইসলামবিরোধী বলার চেষ্টা করেছেন, অত্যন্ত অনুতাপের সাথে বলতে হয় ওই ভদ্রলোকরা হয় ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে সম্যক কোনো জ্ঞান রাখেন না অথবা জেনে সত্য প্রকাশে ভয় পাচ্ছেন। কেউ কেউ নারী শিক্ষায় ইসলাম ধর্মে নারীর প্রতি উদারতার কথা বলছেন অথচ কোন তথ্য উল্লেখ করতে পারেন নাই।

একজন আলোচক বললেন, ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক হযরত মুহম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘জ্ঞান আহরণের জন্য সুদূর চীন দেশে যাও।’ এই বক্তব্যের পক্ষে আজ পর্যন্ত কোন ইসলামী আলেম কোন প্রমাণ দিতে পারেন নাই। ইসলাম ধর্মের মূল ভিত্তি কোরআন এবং হাদিস। কোরআন এবং হাদিসে (সহিহ হাদিস সমূহে) কোথায়ও এই বক্তব্যের (জ্ঞান আরোহণের জন্য সুদূর চীন গমন কর) স্বপক্ষে কোন তথ্য প্রমাণ নাই। এই বক্তব্যটির বাংলাদেশি ইসলামী আলেমদের একটি নির্জলা মিথ্যা প্রচার যার কোন ভিত্তি কোরআন এবং হাদিসে নাই। এখন আসুন আলোচনা করা যাক কেন আল্লামা শফি সাহেব মেয়ে/নারী শিক্ষার বিপক্ষে তার নির্দেশ বা বক্তব্য? তিনি কি ইসলামবিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন? আমার সামান্য ইসলামী জ্ঞান বলছে তিনি কোরআন এবং হাদিসের আলোকে এই নির্দেশনা দিয়েছেন তার অনুসারীদের জন্য এবং ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী সকল ধর্মপ্রাণ (মুসলমান) মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি এবং তার দলসহ সকল ইসলামি রাজনৈতিক দল এমনকি অনেক ধর্মপ্রাণ মুসলিম মনে করেন বাংলাদেশে ইসলামি শরিয়া আইন চালু করা হউক, তবেই নাকি দেশে আইনের শাসন সামাজিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে। 

যেহেতু আল্লামা শফি সাহেব একজন ধর্মপরায়ণ এবং ইসলামি শরিয়া আইন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে হেফাজতে ইসলামী বাংলাদেশ নামে রাজনৈতিক দল গঠন করেন। যেহেতু হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশে শরিয়া আইন প্রতিষ্ঠায় বিশ্বাসী তাই ইসলামিক বিধান অনুযায়ী মেয়ে/নারীদের শিক্ষার কোন প্রয়োজন নাই, কেবল মাত্র কোরআন-হাদিসই তাদের শিক্ষার জন্য যথেষ্ট। অতএব আল্লামা শফি সাহেব সম্পূর্ণ ইসলামি বিধানের আলোকেই তার বক্তব্য পেশ করেছেন।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মুক্তিযাদ্ধের বিজয়ের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন গণতান্ত্রিক, শোষণমুক্ত ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র গঠিত হয়। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যার পরবর্তীতে ক্ষমতার অবৈধ ব্যবহার করে সামরিক সরকাররা (জে. জিয়া এবং জে. এরশাদ) সংবিধান সংশোধন করে নিষিদ্ধ ধর্মীয় রাজনীতির অনুমোদন এবং সংবিধানে বিসমিল্লাহ সংযোজন করে ধর্মনিরপক্ষ রাষ্ট্রকে বিশেষ একটি ধর্মীয় রাষ্ট্রে পরিণত করে। 

তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে নানা নামে ধর্মভিত্তিক দল গঠিত হয়। এমনকি বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রত্যেক্ষ বিরোধী দল জামায়েত ইসলামী রাজনীতি করার সুযোগ লাভ করে (১৯৭২ এর সংবিধানে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়)। 

যেহেতু বর্তমানে বাংলাদেশ সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বলবৎ আছে তাই কোন ইসলামি আলেম বা দলনেতা ইসলামি শাসন ব্যবস্থার অন্যতম একটি দিক জনসংখ্যার অর্ধেক নারীর অবস্থান কী হবে সে বিষয়ে ইসলামি শরিয়া আইন অনুযায়ী যেভাবে দিকনির্দেশনা দেওয়া আছে তাই করার নির্দেশ দিয়েছেন তাতে দোষের কি আছে?   

তাহলে এখন প্রশ্ন আসে আমরা কি চাই? বাংলাদেশ কি ইসলামি শাসন ব্যবস্থায় পরিচালিত হবে নাকি ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে পরিচালিত হবে? যদি ইসলামি শাসন ব্যবস্থা অনুযায়ী পরিচালিত হয় (রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম) তাহলে আল্লামা শফি সাহেব যথার্থই বলেছেন বলে আমি মনে করি। 

যদি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র কাঠামোর ভিত্তিতে পরিচালিত হতে হয় তাহলে সর্বপ্রথম যা প্রয়োজন তাহলো ৭২এর সংবিধানে ফিরে যাওয়া এবং ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করা। যতক্ষণ পর্যন্ত ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ না করা হবে ততোক্ষণ পর্যন্ত শফি সাহেবের মত আলেমদের আহ্বান/নির্দেশের সমালোচনা/বিরোধিতা করাটা যুক্তিসংগত কি?

লেখক: সিডনি প্রবাসী

মতামত লেখকের নিজস্ব

নিউজবাংলাদেশ.কম/এমএস