artk
রোববার, ডিসেম্বার ১০, ২০১৭ ৮:১৬

মামুন আজাদের দুটি ছোটগল্প

media

তাবিজ

আগুন আগুন বললেই বুড়ির অবস্থা হতো দেখার মতো! গোঙ্গাতে গোঙ্গাতে আল্লাহ আল্লাহ বলে পড়ি মড়ি করে পালাতো। বড়দের কড়া ধমক খেয়েও বুড়িকে ক্ষেপাতে খুব মজা পেতাম। স্কুল পালানো দিনগুলো কাটছিলো বেশ আনন্দে।

বুড়ির নাম ছিল নজিরননেছা। আমরা ডাকতাম নজু দাদি। আমাদের বাড়িতে টুকটাক ফাই-ফরমাস খাটতো। বুড়ির ছোট ছেলে হানিফ চাচা আমার চেয়ে বছর দশেক বড়। আমাদের বাড়িতে মাইন্দারের কাজ করতো। কলুনি পাড়ার ছোট্ট ঘর থাকলেও মা-বেটার আস্তানা ছিল আমাদের বাড়িতেয়। ওরা ছিল মূলত ‘কাজের লোক’। তবুও মাকে দেখেছি নজু দাদির সাথে বেশ সম্মান দিয়ে কথা বলতে।

মুন্সি বাড়ির ছেলে হওয়ায়, বয়স বার হতেই নামাজের জন্য কড়া নির্দেশ আসা শুরু হলো। জায়গীর মাষ্টারের ডাকে কাক ভোরে ঘুম ভাঙ্গতো আমাদের। ভোরে নামাজ পড়ে আরবি পড়া, চোখ কচলাতে কচলাতে পুকুর ঘাটে ওজু করতে গিয়ে প্রায় প্রতিদিনই নজু দাদিকে দেখতাম ওজু করতে। ‘বুড়ি কি আমাদের মতো আরবি পড়ে’ মাকে বলতেই উনি বললেন,’ না বাবা, ফজরের নামাজ তোমার নজু দাদি কোনদিন কামাই করেন না। মার কাছে শুনলাম প্রতি বৃহস্পতি, শুক্রবার বুড়ি রোজা রাখেন। সারা বছর রোজা রাখেন? প্রশ্ন করতেই মা যা বললেন শুনে আমার মনটা কেঁদে উঠলো।

বুড়ির আসল বাড়ি ছিল ভারতের বশিরহাটে। তিন ছেলে আর এক মেয়ে নিয়ে ওনাদের অবস্থা আমাদের চেয়ে ভালো ছিল। উঠানে চার চারটে ধানের গোলা ! পাকিস্থান হওয়ার বছর খানেক আগে কোন এক শুক্রবারে ‘ওরা’ তার দুই ছেলে আর তাদের বাপকে গোলার ভেতর জ্যান্ত পুড়িয়ে মারলো। বুড়ি তার ছোট ছেলে হানিফ আর মেয়ে জোবাইদাকে নিয়ে ওখান থেকে পালালো। পরের বৃহস্পতিবার জুবাইদাকে ‘ওরা’ ধরে নিয়ে গেল। বুড়ির চিৎকার ফরিয়াদ আল্লাহর দরবারে পৌছায়নি; পৌছালেও কোন আসমানী সাহায্য বুড়ি পাইনি। তারপর থেকে বুড়ি তার ছেলেকে নিয়ে বর্ডার পার হয়ে আমাদের গ্রামে হাজির। পাচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন আর প্রতি বৃহস্পতি, শুক্রবার রোজা রাখেন।
এরপর থেকে আর কোনদিনই বুড়িকে আগুন আগুন বলে ক্ষেপায়নি।

ছাত্র হিসাবে ভালোই ছিলাম। প্রায় মাইল তিনেক দূরে পাকা সড়কের পাশে হাই স্কুলে রোজ হেটে যেতাম। গ্রামে বাড়ি হলেও দেশের অবস্থা যে ‘বিশেষ সুবিধার’ না সেটা বেশ টের পেতাম। হাই স্কুল ছেড়ে কলেজে উঠলাম। দেশের অবস্থা তখন উত্তাল। ঘটনাগুলো ঘটছিল ‘ঘটনার নিয়মে’। উনসত্তরের গনঅভ্যুথানে সারাদেশে অস্থিরতা। সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুলভাবে জয়ি হলো। কিন্তু ‘পাঞ্জাবীরা’ গদি ছাড়বেনা। একাত্তরে সাত মার্চে বঙ্গবন্ধুর ভাষন, ছাব্বিশ তারিখে স্বাধীনতার ঘোষনা আমার মনে উন্মাদনা এনে দিল। সুযোগ খুঁজতে লাগলাম যুদ্ধে যাবার। হানিফ চাচাকে বলতেই উনি আঁতকে উঠলেন, মুসলমান হয়ে মুসলমানকে মারবো! কিন্তু এপ্রিলের শেষে রাজাকারদের নিয়ে পাকিস্থানী মিলিটারিরা যখন উত্তরপাড়ার ঈমাম সাহেবের বাড়ি জ্বালিয়ে দিল। তারপর থেকে হানিফ চাচা নিরুদ্দেশ ! খোজ নিয়ে জানলাম চাচা ‘ওপারে’ গেছেন প্রশিক্ষন নিতে। বুড়ি এই খবরে একদম চুপ। কথা প্রায় বলেনই না। একদিন আমাকে আড়ালে ডেকে বললেন, দাদুভাই তোমার চাচার সাথে দেখা হলে এই ‘তাবিজ’ টা দিও। আজমীর শরীফের তাবিজ, খুব শক্তিশালী, আল্লাহ ওকে ভালো রাখবেন। বুড়ি কিভাবে জানি বুঝে গেছে পরদিনই ভারতে যাবো ট্রেনিং নিতে।

ভারতে রিক্রটমেন্ট, ট্রেনিং কখন যে দুই মাস পার হয়ে গেছে টের পাইনি। ‘তাবিজ’টা আমার গলায়। হানিফ চাচার সঠিক খবর পাইনি। সবই ভাসা ভাসা খবর। হঠাৎ কমান্ডিং স্যার আদেশ দিলেন এ্যাকশনে যেতে হবে। পরবর্তী তিনমাস অনেকগুলো অপারেশনে ছিলাম। ভাগ্যগুনে নাকি তাবিজের গুনে দু’দুবার মরতে মরতে বেঁচে গেলাম। বিভিন্ন জায়গায় ছুটতে ছুটতে চৌগাছায় ‘হানিফ চাচার’ খবর শুনলাম। মুসলমান হয়ে ‘মুসলমানের’ সাথে বীরের মতো যুদ্ধ করে দেশের জন্য শহীদ হয়েছেন চাচা। তাবিজ টা দেওয়া হলো না।

ডিসেম্বরে বিজয়ের আনন্দে বাড়ি ফিরছি। পরিচিত মাঠ,স্কুল,সড়ক পেরিয়ে দুরে মুন্সি বাড়ি দেখা যায়। হঠাৎ গলায় ‘তাবিজে’র স্পর্শে চমকে উঠলাম। কি জবাব দেবো বুড়িকে? সুবহ-সাদিকের রেশ আস্তে আস্তে কাটছে। চুপি চুপি পেছন দিক দিয়ে বাড়িতে ঢুকলাম। ভূত দেখার মতো চমকে উঠলাম, উঠানে বুড়ি দাড়িয়ে।‘ তাবিজ’টা বুড়ির কাছে ফেরত দিলাম। বললাম, দাদী আল্লাহ তোমাকে নিঃশ্চয় বেহেশত নসিব করবেন। তুমি এখন থেকে বুধবারেও রোজা রেখ।
আফছা আলোয় বুড়ির চোখে পানি দেখলাম না। স্পষ্ট দেখি তার ঘোলা চোখে স্টেনগানের আগুন।

একটি গল্পের প্লট
উৎসর্গ: এআর পিন্টু (একজন কবি ও বাবা)

কবিতার আসরে ভদ্রলোকের সাথে পরিচয়। বয়স টাকে যে এভাবে ঢেকে রাখা যায় ওনাকে না দেখলে বিশ্বাস করতাম না। রিটায়ার্ড করেছেন বছর তিনেক তবুও মনে হচ্ছে বয়স বড়জোর চল্লিশের আশপাশ! বিজ্ঞাপন কোম্পানিগুলো ওনাদেরকেই তাদের ‘ফেস ক্রিমের প্রচারের’ জন্য হাজির করেন; ‘ ব্যাবহারের আগে এবং ব্যাবহারের পরে’। যা হোক ভদ্রলোক পরিচয়ে বললেন, কবিতা লিখছেন মাস পাচেঁক; তার মানে নতুন কবি। সব নতুন কবিদের মতো ওনার ভেতরও ভীষন উচ্চাষ। তাই প্রথম আসরেই আমাদেরকে চায়ের দাওয়াত দিলেন ওনার বাসায়। নতুন হোক আর পূরানো, সব কবিইতো আড্ডা ভালোবাসে। সুতরাং নতুন ‘মুশায়রা’র লোভ সামলাতে না পেরে নিদিষ্ট দিনে আমরা হাজির।

ওনার বাসায় উপস্থিত হয়ে আমরা সবাই কিন্তু মনে মনে বেকুব হয়ে গেলাম। আজ শুধু আমার কবিতা গুলো আপনাদের শোনাবো, আপনাদের কবিতা শুনবো অন্যদিন, ভদ্রলোকের প্রথম ভাষনে আমরা খুব সংগোপনে নিজেদের কবিতা গুলো লুকিয়ে ফেললাম।

শুরু হলো কবিতা। সাধারনত নতুন কবিরা যেমন লেখে। ছন্দ, মাত্রা ঠিক নেই, বক্তব্যের খেই হারিয়ে ফেলা, আবেগের আতিশায্য,কোন বিখ্যাত কবির অনুকরন ইত্যাদি ইত্যাদি। পরপর গোটা দশেক কবিতা পড়া শেষ না হতেয় আমাদের উৎসুক শুরু হয়ে গেল। কারো ফোন আসা, জরুরি ফোন করা,টয়লেট যাওয়া, ঘনঘন ঘড়ি দেখা। কিন্তু কবি মশায়ের তাতে থোড়াই কেয়ার। আমাদের দিকে তার খেয়ালই নেয়। ঠিক মনে নেই, হয়তো আরো বিশ মিনিট পর উনি ঘোষনা করলেন, এবার তার শেষ কবিতা পাঠ হবে এবং তার পরেই চায়ের আসর।

আমরা বেশ আশান্বিত হয়ে নড়ে-চড়ে বসলাম। কবিতার নাম ঘোষনার আগে উনি ছোট্ট ভূমিকায় বললেন কবিতাটি তার ‘বড় মেয়েকে’ নিয়ে লেখা। তারপর উল্টো দিকের দেয়ালে টাঙ্গানো মেয়েটার বিশাল ফটোগ্রাফের দিকে তাকিয়ে চোখ মুছে জানালেন, চল্লিশ বছর আগে মাত্র পাচঁ বছর বয়সে মেয়েটি মারা গেছে। যে কবি এতক্ষণ একটানা ঘন্টা ধরে বিরামহীনভাবে কবিতা পাঠ করছিলেন। তিনিই ছোট একটি কবিতা পাচঁ বারের চেষ্টাও শেষ করতে পারলেন না।

চল্লিশ বছরের পুষে রাখা দুঃখগুলো পিতার বুকে জমে ছিল আগ্নেগিরির মতো। আজ আমাদের পেয়ে একটি কবিতা হয়ে উদ্গিরন হলো এক নিমিষে। সন্তান হারা বাবা মূহুর্তে হয়ে গেলেন পাবেলো নেরুদা কিংম্বা আরো বড় কবি।

আমরা সবাই স্পষ্ট অনূভব করলাম, পাচঁ বছরের ছোট টুকটুকে মেয়েটার নুপুরের আওয়াজ, কাচেঁর চুড়ির রিনঝিন শব্দ,কচি হাতে মেয়েটি তার বাবা’র গলা জড়িয়ে ধরে আমাদের দেখছে দুষ্টামিভরা চোখে!

কখন কবিতার আসর শেষ হলো মনে নেই। চায়ের আসরটা বিশেষ জমলো না। আমরা সবাই অপরাধির মতো কোন রকমে ওখান থেকে পালালাম।

গেট থেকে বের হয়ে মনে হলো চমৎকার ‘একটা গল্পের প্লট’ পাওয়া গেলতো!

 

পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট ধর্ষক: প্রধানমন্ত্রী করোনা ভাইরাসের কারণে হজে যাওয়া না হলে টাকা ফেরত: ধর্ম প্রতিমন্ত্রী দাঙ্গা নয়, দিল্লিতে পরিকল্পিত গণহত্যা হয়েছে: মমতা ভারতের সম্মান তলিয়ে দিয়েছে মোদি সরকার: মমতা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে সুনামগঞ্জে এনামুল-রুপন ছয় দিনের রিমান্ডে পিরোজপুরে সাবেক ইউপি সদস্যকে কুপিয়ে হত্যা চলতি বছরই তিস্তা চুক্তির সম্ভাবনা: শ্রিংলা ঢাকা উত্তরের নির্বাচন বাতিল চেয়ে তাবিথের মামলা খুলনায় ছাত্রলীগ নেতাকে পিটিয়ে হত্যা অভিনেতা গোলাম মুস্তাফার জন্মদিন সোমবার আদালতে টাউট-বাটপার শনাক্তের নির্দেশ পাওয়ার ট্রলিকে ধাক্কা দিয়ে বিকল রেলইঞ্জিন কলকাতা সফরে এসে প্রবল বিক্ষোভের মুখে অমিত শাহ রোবট চালাবে গাড়ি! ভিপি নূরকে হত্যার হুমকি দেয়ার পর দুঃখ প্রকাশ টেকনাফে র‌্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ৭ জন নিহত রাখাইনপ্রদেশে সেনাদের গুলিতে শিশুসহ ৫ রোহিঙ্গা নিহত ইস্কাটনে ভবনে আগুন: মায়ের পর চলে গেলেন রুশদির বাবাও চট্টগ্রামে একটি বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডে নিহত ২ দেশে প্রতিদিন যক্ষ্মায় মারা যায় ১৩০ জন: স্বাস্থ্যমন্ত্রী করোনাভাইরাস আতঙ্কে আয়ারল্যান্ডের স্কুল বন্ধ ঘোষণা বিশিষ্ট সুরকার সেলিম আশরাফ আর নেই মোদীকে অতিথি হিসেবে সর্বোচ্চ সম্মান দেওয়া হবে: পররাষ্ট্রমন্ত্রী মধুর যত জাদুকরী গুণ চিপসের প্যাকেটের ভিতর খেলনা নয়: হাইকোর্ট আমার গাড়িতেও অস্ত্র আছে কী না আমি জানি না: শামীম ওসমান ফ্র্যান্সেও করোনা, অনিশ্চিত কান চলচ্চিত্র উৎসব উপনির্বাচন: গাইবান্ধা-৩ আসনে প্রতীক বরাদ্দ গুজব ও গণপিটুনি রোধে হাইকোর্টের ৫ নির্দেশনা